বাজারে আসছে ‘বিস্ময়কর’ বাতি

0
1

বিদ্যুৎ খরচ হবে তুলনামূলক কম। টিকে থাকবে বছরের পর বছর। আবার বাজারে প্রচলিত এলইডি বাতির (বাল্ব) তুলনায় দামেও সস্তা।‘বিস্ময়কর উপাদান’ দিয়ে তৈরি এমন বাল্ব চলতি বছরের শেষ নাগাদই বাজারে আসছে।
গ্রাফিন নামের একধরনের কার্বন উপাদান দিয়ে প্রথম বাণিজ্যিক পণ্য হিসেবে তৈরি করা হয়েছে এই বাল্ব। কাচের মতো স্বচ্ছ এই উপাদান ইস্পাতের তুলনায় প্রায় ২০০ গুণ বেশি শক্তিশালী। অথচ এটি মানুষের চুলের চেয়ে লাখ লাখ গুণ সরু। নামীদামি বিভিন্ন পণ্যে ব্যবহারের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে গ্রাফিনের। এসব কারণেই গ্রাফিনকে বলা হচ্ছে ‘বিস্ময়কর উপাদান’।
গ্রাফিন বাল্ব তৈরি করছে গ্রাফিন লাইট নামের একটি প্রতিষ্ঠান। কানাডার অর্থায়নে পরিচালিত এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটির সম্পর্ক রয়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়েই ২০০৪ সালে আবিষ্কার করা হয়েছিল এক অণুর সমান পুরু গ্রাফিন উপাদান। আর গ্রাফিন লাইটের পরিচালকদের একজন অধ্যাপক কলিন বেইল ম্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটির সহ-উপাচার্য।
যুক্তরাজ্যের বাজারে প্রচলিত একটি এলইডি বাল্বের দাম কমবেশি ১৫ পাউন্ড। তার চেয়ে কম দামেই পাওয়া যাবে গ্রাফিন বাল্ব। এটির নকশা করা হয়েছে প্রচলিত বাল্বের মতোই। তবে বাল্বের ফিলামেন্টে গ্রাফিন ব্যবহারের কারণে বিদ্যুৎ ও তাপমাত্রাকে অধিকতর কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যাবে।
বাল্বটি নিয়ে দারুণ আশাবাদী অধ্যাপক কলিন। বললেন, ‘গ্রাফিন বাল্ব কম জ্বালানি ব্যবহার করবে। এটি দীর্ঘস্থায়ী হবে বলে আমরা আশা করছি। এতে অধিকতর টেকসই উপাদান ব্যবহার করা হয়েছে। উৎপাদন খরচও কম হবে।’
ম্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটির রুশ বিজ্ঞানী স্যার কনস্টানটিন নভোসেলভ ও আন্দ্রেঁ গেইম ২০০৪ সালে গ্রাফিন আবিষ্কারের ঘোষণা দেন। এই আবিষ্কারের জন্য তাঁরা ২০১০ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।
অনেকগুলো ন্যানোটিউবকে না মুড়িয়ে একটির ওপর আরেকটি রেখে দিলে যে কাঠামোটি গঠিত হয়, স্থূলভাবে তার সঙ্গে গ্রাফিনের তুলনা করা যেতে পারে। এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত সব মৌল ও যৌগের মধ্যে সবচেয়ে ভালো বিদ্যুৎ পরিবাহী গ্রাফিন। প্লাস্টিকের মধ্যে মাত্র ১ শতাংশ গ্রাফিন মেশালেই তা তড়িৎ সুপরিবাহীতে পরিণত হতে পারে।
ম্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটির আচার্য হর্জ ওসবরন ২০ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যাশনাল গ্রাফিন ইনস্টিটিউটের উদ্বোধন করেন। এটি নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৬২ মিলিয়ন পাউন্ড। এর মধ্যে ব্রিটিশ সরকার দিয়েছে ৩২ মিলিয়ন পাউন্ড। বাকি অর্থ এসেছে ইউরোপীয় আঞ্চলিক উন্নয়ন তহবিল থেকে। বর্তমানে চীন ও দক্ষিণ কোরিয়া গ্রাফিন প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণায় বেশ এগোলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য ওসবরনের প্রত্যাশা, ন্যাশনাল গ্রাফিন ইনস্টিটিউট এই প্রযুক্তির ক্ষেত্রে বিশ্বে যুক্তরাজ্যকে চালকের আসনে বসিয়ে দেবে।
এখন পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ৩৫টির বেশি প্রতিষ্ঠান গ্রাফিন প্রকল্প নিয়ে ম্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটির কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েছে। বিশাল পরিমাণে গ্রাফিন তৈরির কাজটা মোটেও সহজ নয়। তবে অনেকগুলো প্রতিষ্ঠানই তা উৎপাদনের চেষ্টা করে আসছে। এর মূল কারণ হচ্ছে গ্রাফিন ব্যবহারের সম্ভাব্য বিরাট পরিধি।
নানা কাজে গ্রাফিন ব্যবহার করতে এরই মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেছে। টেনিস খেলায় ব্যবহৃত র্যাকেট প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান হেড তাদের কার্বন ফাইবার দিয়ে নির্মিত র্যাকেটে গ্রাফিন ব্যবহার করতে শুরু করেছে। এরপর নকল দাঁত তৈরিতেও এই উপাদান ব্যবহার করতে কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি।
তবে গ্রাফিনের ব্যবহার যে খাতে বিপ্লব আনতে পারে, সেটা হলো ওষুধ খাত। ন্যানো প্রযুক্তির ক্রমবর্ধমান ব্যবহারের ফলে গ্রাফিনকে ক্যানসার ও পারকিনসন্সের মতো রোগের চিকিৎসায় ব্যবহার করা সম্ভব হতে পারে। এ ছাড়া ওজনে হালকা কিন্তু শক্তিশালী গাড়ি ও আকাশযান তৈরিতে এখন গ্রাফিন ব্যবহারে প্রতিযোগিতা শুরুর অপেক্ষা। আবার শক্ত, টেকসই এবং জ্বালানি হিসেবে আলো শুষে নিতে সক্ষম হওয়ায় মুঠোফোন, ক্যামেরা এবং পরিধেয়যোগ্য প্রযুক্তিপণ্য তৈরিতেও গ্রাফিনের সম্ভাবনা প্রচুর।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here