ডিপিডিসি’র এক দশক

5
8
ডিপিডিসির ধানমন্ডি সাবস্টেশনের নকশা

টাকার উপর যেমন লেখা থাকে ‘চাহিবা মাত্র গ্রাহককে দিতে বাধ্য থাকিবে’ তেমনই ‘ডাকা মাত্র সেবা দিতে বাধ্য থাকার’ প্রত্যয় নিয়ে চলছে ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ডিপিডিসি)। নির্ভরশীল বিদ্যুৎ আর উৎফুল্ল গ্রাহক তৈরী এখন তাদের কাজ।
তবে পুরোপুরি সেই পর্যায়ে এখনও পৌছেনি। কিছু সমস্যা আর অভিযোগ কাধে নিয়েই এখনও চলছে। ডিপিডিসিকে অভিযোগ মুক্ত উৎফুল্ল গ্রাহক পর্যায়ে আনতে কর্তৃপক্ষ ২০২১ সাল পর্যন্ত সময় নিয়েছে।
কর্তৃপক্ষের আশা এই সময়ের পরে রাজধানি ঢাকায় ত্রুটির কারণে আর বিদ্যুৎ বিভ্রাট হবে না। বেশি বিদ্যুৎ নেয়ার কারণে ট্রান্সফরমার নষ্ট হবে না। বৃষ্টি হলেই অন্ধকারে থাকতে হবে না। অভিযোগ করে ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করা লাগবে না। কম ব্যবহার করে বেশি বিল হওয়ার ঝামেলা নিয়ে লাগবে না দৌড়ানো। আর সবচেয়ে বড় যে ভোগান্তি, নতুন গ্রাহক হতে – তারও অবসান হবে। অনলাইনে আবেদন করলেই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে। বিদ্যুৎ পেতে অবস্থান বিবেচনার প্রয়োজন নেই। সব জায়গাতে সকল গ্রাহক সমান বিদ্যুৎ পাবে।

dpdc graf
এগুলো সব ভবিষ্যৎ। ভবিষ্যতে ঢাকার বিদ্যুৎ ব্যবস্থা এমনই করার লক্ষ ঠিক করেছে ডিপিডিসি। আর সেই জায়গাতে যেতে নেয়া হয়েছে অনেক কর্মপরিকল্পনা। অনেক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। দ্রুত সময়ে শেষ হবে কিছু কাজ। কিছু কাজ চলতে থাকবে ২০২১ পর্যন্ত বা তারও পর। আর এই চলতে থাকাটা ধারাবাহিকতারই অংশ।
যাত্রা শুরুর এক দশক পার করেছে ডিপিডিসি। ২০০৫ সালের ২৫শে অক্টোবর কোম্পানি গঠনের পর থেকে চলছে এই যাত্রা।
ডিপিডিসির দশ বছরে উৎফুল্ল গ্রাহক তৈরীতে কোন পর্যায়ে এসেছে জানতে চাইলে এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নজরুল হাসান (অব) বললেন, এখন ডিপিডিসিতে কোন লোডশেডিং নেই। ত্রুটি মুক্ত সরবরাহ ব্যবস্থার অনেকটাই এগিয়েছে। গ্রাহকদের কাছে জবাবদিহি করা হচ্ছে। গণশুনানীর মাধ্যমে মুখোমুখি হচ্ছি গ্রাহকদের। এতে গ্রাহকের আস্থা বাড়ছে। আরও উন্নত সেবা দিতে প্রযুক্তিগত উন্নয়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। এমন দিন আসছে যে গ্রাহকের আর কোন অভিযোগ থাকবে না। ঘরে বসেই সব সেবা পাবে। এখন উন্নত সেবাকেই প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে সবচেয়ে বেশি।

dpdc dimand
সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে চলছে ডিপিডিসি। এক সময় বিদ্যুতের ঘাটতি ছিল। সাথে ছিল জরাজীর্ণ বিতরণ ব্যবস্থা। এক খুটি থেকে বিশৃংখলভাবে শত লাইন। কোন নিয়ন্ত্রনই যেন ছিল না। এখনও অনেক স্থানে আছে এমন। বিশৃংখল, বিপদজনক তারের মেলা। তবে অনকে স্থানে উন্নতি হয়েছে।
বিদ্যুতের ইচ্ছে মত লোডশেডিং আর সরবরাহে সমস্যার কারণে থাকতে হত অন্ধকারে। সরবরাহ আর লোডশেডিং দুই মিলে দিনে ১০/১২ বার বা তারও বেশি বিদ্যুৎ বিভ্রাটকে মোকাবেলা করতে হতো। ঢাকারচার ধাওে যে ছোট ছোট শিল্প তার চাকা ছিল স্থির। সেই অবস্থার এখন অনেকটা পরিবর্তন হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন চাহিদার সাথে মিল করে বেড়েছে। এতে লোডশেডিং কমেছে। সাথে উন্নত হয়েছে সরবরাহ ব্যবস্থা।
কিছু তুলনা
বর্তমানে ডিপিডিসির গ্রাহক ১০ লাখ। এই গ্রাহকদের অথনৈতিক, সামাজিক ও মানবিক উন্নয়নে অংশীদার হতে কাজ করছে ডিপিডিসি। ২০০৮ সালের ১লা জুলাই ডেসা থেকে নিয়ে ডিপিডিসি মুল কার্যক্রম শুরু। তবে ২০০৫ সালের ২৫ অক্টোবর ছিল প্রথম দিন। তখন ডিপিডিসি বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ৯৫৭ মেগাওয়াট। আর এখন চাহিদা বেড়ে হয়েছে এক হাজার ৪৭০ মেগাওয়াট। ২০২১ সালে চাহিদা দ্বিগুণ হয়ে হবে দুই হাজার ৯০২ মেগাওয়াট। ২০৩৫ সালে এই চাহিদা হবে ১০ হাজার ৫৫ মেগাওয়াট।
২০০৮ সালে যখন যাত্রা শুরু তখন পদ্ধতিগত লোকসান ছিল ১৮ দশমিক পাঁচ শতাংশ। গত দশবছরে ১০ শতাংশ লোকসান কমেছে। এখন এই লোকসানের হার আট দশমিক ৯১ শতাংশ।

dpdc bill collection graf
আগে বিলের চেয়ে আদায় কম হত। এখন বিলের চেয়ে আদায় বেশি হচ্ছে। ২০১৪ সালের জুলাই মাসে ডিপিডিসি’র বিদ্যুৎ বিল হয়েছে ৪৬০ কোটি টাকা। আদায় হয়েছে ৩৭৬ কোটি টাকা। কিন্তু ২০১৫ সালের জুন মাসে বিল হয়েছে ৪৪৬ কোটি টাকা। আদায় হয়েছে ৫৫৪ কোটি টাকা। আয় ও সম্পাত্তির পরিমানও দিন দিন বাড়ছে। ২০১৪-১৫ অর্থবছর ডিপিডিসি কর ছাড়া আয় করেছে ২৬৫৬ মিলিয়ন কোটি টাকা। বর্তমানে সম্পত্তির পরিমান ৭৯৩১৪ দশমিক ৩৪ মিলিয়ন কোটি টাকা।

ভবিষ্যৎ ডিপিডিসি
২০১৮ সালের মধ্যে ডিপিডিসির সকল গ্রাহককে প্রিপেইড মিটারের আওতায় আনা হবে। এজন্য কয়েক পর্বে প্রিপেইড মিটার লাগানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। প্রিপেইড মিটার হলে ভুতুড়ে বিদ্যুৎ বিলের ঝামেলা থাকবে না। কর্তৃপক্ষেরও ঘরে ঘরে গিয়ে আর বিল করা লাগবে না। পদ্ধতিগত লোকসানও কমে যাবে অনেক।
বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় যে কার্যক্রম তা হল সয়ংসম্পূর্ণ হওয়া। কিছু বাণিজ্যিক কার্যক্রমের শুরু করা। এতে নগরীর সৌন্দর্য এবং ডিপিডিসির আয় দুটোই বাড়বে। এই কার্যক্রমের অংশ হিসেবে করা কয়েকটি বহুতল ভবন। ডিপিডিসির নিজস্ব জায়গায় এই ভবন করা হবে। নিজস্ব বহুতল ভবন হবে নগরীর ধানমন্ডি, মগবাজার, তেজগাঁও, কাকরাইল, মতিঝিল ও হাতিরঝিলে। এসব ভবনে ডিপিডিসির কার্যালয় করার পাশাপাশি ভাড়া দেয়া হবে।

dpdc meters

ডিজিটাল কার্যক্রম
ডিপিডিসির এখন অনেক কার্যক্রম অনলাইনে শুরু হয়েছে। নিজস্ব ওয়েব সাইট হালনাগাদ করা হচ্ছে। অনলাইনে গ্রাহককে বিভিন্ন সেবা দেয়া হচ্ছে। মোবাইল এপস এর মাধ্যমে মিটার রিডিং নেয়া হচ্ছে। সফটওয়ারের মাধ্যমে বিলিং কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। এসএমএস এবং অনলাইনের মাধ্যমে বিল আদায় হচ্ছে। সফটওয়্যারের মাধ্যমে গ্রাহকের অভিযোগ নেয়া হচ্ছে। এছাড়া কর্মকর্তাদের কার্যক্রম, মালামাল ব্যবস্থাপনাসহ অন্য কার্যক্রমও অনলাইনে করা হচ্ছে।
চলমান উন্নয়ন কার্যক্রম
রাজধানি ঢাকা ও নারায়নগঞ্জ এলাকার ৩৫০ বর্গ কিলোমিটার এলাকায় ডিপিডিসি বিদ্যুৎ সরবরাহ করে। এই এলাকায় নতুন করে ২২টি উপকেন্দ্র করা হচ্ছে। এই অবকাঠামো স্থাপনের ডিপিডিসির বিদ্যুৎ বিতরণ ক্ষমতা বাড়বে প্রায় এক হাজার ৫০০ মেগাওয়াট। ২০১৭ সালের জুনের মধ্যে এই উপকেন্দ্রগুলো স্থাপনের কাজ শেষ হওয়ার কথা। কাজ শেষ হওয়ার পর সরবরাহ ক্ষমতা বেড়ে দাঁড়াবে প্রায় সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াট। দুইটি প্রকল্পের আওতায় ২০০ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ে এসব সাবস্টেশন স্থাপন কর হচ্ছে। এরমধ্যে একটি প্রকল্পে অর্থায়ন করছে ফ্রান্সের ব্যাংক এএফডি। তাদের অর্থায়নের সাতটি ১৩২ কেভি গ্রিড সাবস্টেশন ও সাতটি ৩৩ কেভি গ্রিড সাবস্টেশন স্থাপন করা হবে। এতে খরচ হবে ১২৫ মিলিয়ন ডলার। ১৩২ কেভি সাবস্টেশনগুলো মতিঝিল, জিগাতলা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ফতুল্লা, চর সৈয়দপুর, রমনা ও পোস্তগোলায় স্থাপন করা হবে।

dpdc Kakrail
ডিপিডিসির কাকরাইল সাবস্টেশনের নকশা

অন্য প্রকল্পটিতে অর্থায়ন করছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। ৭৫ মিলিয়ন ডলারে মোট আটটি ৩৩ কেভি সাবস্টেশন স্থাপন করা হবে। এর বাইরে আরো ৪১টি সাবস্টেশনের পরিকল্পনা আছে। চীনের সরকারি সহায়তায় এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। ওভারলোডেড ট্রান্সফরমার এখন ৩০ শতাংশ। এটি কমিয়ে ২০ শতাংশ করারও লক্ষ ঠিক করা হয়েছে।
সর্বপরি ২০১৬ সাল ডিপিডিসিকে দুর্নীতি মূক্ত করার বছর ঘোষণা করা হয়েছে।

5 COMMENTS

  1. ডিপিডিসি এত প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য এখনও হয়েছে কী?

  2. টাকা ছাড়া ডিপিডিসিতে কোন কাজই হয়না। আগের মান্ধাতার মতই সেবা এখনও আছে। আর বিদ্যুৎ থাকে এটা তো অন্র কাজ।

  3. তদবির ছাড়া ফাইল আগাই না। এটা সবার আগে ঠিক করতে হবে। এটা ঠিক হলেই ৮০ ভাগ সমস্যার সমাধান হবে।

  4. ডিপিডিসির কাজ বিদ্যুৎ নিয়ে। রিয়েল স্টেট ব্যবসায় করলে আসল দিকে আবার ঘাটতি শুরু না হয়। বিদ্যুতের খেয়াল যেন কমে না যায়। তবে নগরীতে এই ধরণের ভবন হলে, নগরীর সৌন্দর্য বাড়বে – তাতে সন্দেহ নেই।

  5. ভবিষ্যতের কথা সব সময় ভাল হয়। কিন্তু সেই ভবিষ্যৎ যখন বর্তমানে চলে যায় তখন দেখা যায় কিছুই হয়নি। ২০২১ সালে গিয়ে দেখা যাবে এখনকার মতই কথা বলা হচ্ছে। তখন বলা হবে ২০৩০ সালে এই চেহারা হবে। আশা করি তা যেন না হয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here